এই লেখাটি 1,744 বার পড়া হয়েছে

কবি মৃত্তিকা চাকমার কবিতার বই এ্যাংকুর এর উপর একটি সংক্ষিপ্ত সমালোচনা

কবি মৃত্তিকা চাকমার কবিতার বই এ্যাংকুর এর উপর একটি সংক্ষিপ্ত সমালোচনা, মনোজ বাহাদুর র্গুখা

মৃত্তিকা চাকমা আমার এক বছরের ছোট। তার জন্ম ১৯৫৮ সনে আমার ১৯৫৭ সন। আমি গান গাই, গান লিখি, গানে সুর করি। মৃত্তিকা কবিতা. উপন্যাস লিখে এক কথায় সাহিত্য চর্চা করে। তাকে জাক নামে এক সংগঠনের  একনিষ্ট কর্মী হিসেবে আমি জানতাম। আমার সংগীত জগতের সাথে মৃত্তিকাদের খুব একটা ঘনিষ্টতা ছিল না। আমরা যার যার পথে হ্্েঁটেছি। আমার গীতিকাররা ছিল রিপন চাকমা,সুশান্ত চাকমা,ঈশ্বর চন্দ্র তংচংগ্যা,সুগত চাকমা প্রমুখ।

গত ২/৩ বছর যাবত মৃত্তিকার সাথে আমার ঘনিষ্টতা। তার ২/৩টি গানে আমি সুরারোপ করেছি ।  গত আর্ন্তজাতিক আদিবাসী দিবস উপলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে তার গানের উপর উদ্বোধনী নৃত্য করা হয়েছিল। আমার ধারনা মৃত্তিকা আসলে ভাবে নি তার লেখা কবিতা গুলোকে এত সুন্দর ভাবে সচল করা সম্ভব,অর্থাৎ গানে রূপান্তর সম্ভব। আমি আদিবাসী দিবস উপলে টিসিআই ভবনের পেছনের অংশে  জাক আয়োজিত বেশ কটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে  অংশ গ্রহণ করি। মৃত্তিকার সাথে ঘনিষ্টতা ও সে থেকেই শুরু।

মৃত্তিকার সর্বশেষ চাকমা কবিতার বই এ্যাংকুর । ২০১০ বিজু উপলে প্রকাশিত। কবিতার বই টি হাতে পেয়েছি  ২/৩ দিন আগে। প্রকাশনায় ছড়াথুম পাবলিশার্স ত্রিদিব নগর,বনরুপা,রাঙ্গামাটি। প্রচ্ছদ একেছেন নিসা চাকমা। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে শ্রী বীর কুমার চাকমা কে।

আসলে সমালোচনা  করার মত যথেষ্ট জ্ঞান আমার আছে কি না সেটি আমি নিজেও জানি না। এক সিনিয়র জনের অনুরোধ  এল্াে মৃত্তিকার এই বইটির একটি সমালোচনা লিখে দিতে। আমি আগে এ ধরনের লেখা লিখেছি বলে মনে আসছে না। যা হোক। সমালোচনা একটি লিখতে তো হবেই। তাই এই লেখা।

বাংলা হরফে চাকমা ভাষায় লিখিত কবিতার বইটি আমার কাছে খুব একটা সুখ পাঠ্য মনে হয় নি। চাকমা শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণে  বানান লিখতে  গিয়ে বানান গুলো একটু ভিন্নতা পেয়েছে। সাধারণ বাংলা ভাষার পাঠকদের পে বানান ভেঙ্গে ভেঙ্গে কবিতার শেষ পর্যন্ত যেতে যথেষ্ট ধর্য্য পরীা দিতে হতে পারে। মোট ৮৮পৃষ্টার কবিতার বইটিতে কবিতার  সংখ্যা ৬৫টি। আমি যদিও কবিতার বই নামে এই প্রকাশনাকে বর্ননা করেছি কিন্তু কবি মৃত্তিকার ভাষায় এ প্রকাশনাকে তিনি কবিতা গ্রন্থ বলে অবিহিত করেছেন।

২৫ পৃষ্টায় সুদ’হলা ফুল কবিতার প্রোপট বর্ননায়  ”চাঙমা কবি সলিল রায় দাগীর সুরণে” কথাটি লিখা আছে। স্মরণে কথাটির চাকমা উচ্চারণ বানাতে গিয়ে সুরণে লেখাটা আমার মনে ধরে নি। চাকমা ভাষায় যথোপযুক্ত শব্দ খুঁজে তা ব্যবহার করলে ভাষাটি আরো সমৃদ্ধ হতো।
মৃত্তিকা চাকমা বর্তমান আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন রস গ্রহীতা। তার কবিতায় বাঙালী কবি সাহিত্যিকদের কিছু প্রভাব থাকাটা স্বাভাবিক। রবীন্দ্র,নজরুল  থেকে আরম্ভ করে বর্তমান আধুনিক কবিতার আদলে লেখা তার কবিতা গুলোতে ছন্দের প্রয়োগ ল্যনীয়। এমনকি কিছু বাংলা শব্দকে তার চাকমা কবিতায় তিনি সহজে সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। রাগ কবিতাটি তার উৎকৃষ্ট প্রমান।  কবিতার বিষয় বস্তুতে স্বজাত্যবোধ,স্বদেশ প্রেম,বঞ্চনা,আপে,অভিমান এ সবই লনীয়।

চাকমা শব্দের সমাহার তার কবিতা গুলোতে বিশেষ ভাবে ল্যনীয়। যেমন-লাঙনী, কোজোলী,মাজারা,বিজগ,উলমত্য,সিজিগে,
খাঙদিক,লাঙেল দিগোলী,তুবোল,আলাম,টারেঙ,কজমা,গুল চদরী,রুবরাদি,বিদুঙি, ইত্যাদি। কবিতা গুলো চাকমা ভাষা জানা পাঠকের জন্য, সাধারণ পাঠকের পে এসব কবিতা পড়ে, মানে বোঝা সহজ হবে না।

বৃটিশ বিরোধী বিখ্যাত ুদিরাম হতে ভাষা শহীদ সালাম, বরকত কে তার কবিতায় তিনি নিয়ে এসেছেন অত্যন্ত আন্তরিকতায়। কাপ্তাই বাঁধ কে নিয়ে একটি কবিতা রয়েছে, যাতে আত্ম সমালোচনায় নিজেদের প্রতি উদাসীনতাকে তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন শেষ লাইনে-”হালিক আহ্জল কামত বেঘ জন পিজ অহদন”( শুধু আসল কাজে সকলে পিছু হটছেন)

চাকমা সাহিত্যের এক উজ্জল নত্র কবি মৃত্তিকা চাকমাকে জানাই আমার সাদর অভিনন্দন। চাকমা ভাষা নিয়ে আমি বেশ দিন  কাজ করে যাচ্ছি। সে কারণে মৃত্তিকার কবিতা নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি মাত্র। মৃত্তিকাদের আমি বলবো হারিয়ে যাওয়া চাকমা মূল শব্দগুলোকে খুঁজে নিতে, যে সব বাংলা শব্দ তাদের গল্প কবিতায় থাকে সে সব শব্দের চাকমা রূপ থাকাটাই স্বাভাবিক। রাগ শব্দের অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা  পেতে পারে চাকমা বেজার শব্দটি। এধরনের প্রয়াসের ফলে চাকমা ভাষাটি তার আদিরূপ ফিরে পেতে পারে, অন্য শব্দ যোগে ভাষার সমৃদ্ধকরণের সাথে সাথে মৌলিকত্বের দিকে ঝুকে থাকাটাও বাঞ্চনীয়।

বইটির বাঁধাই ভালো। দেখতেও বেশ। প্রচ্ছদের বিষয় বস্তুতে আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে। কবিতাগুলো বর্তমান আধুনিক কবিতার আদলে সুলিখিত। বড় কবিতা আছে  স্ববনর খাঙদিক কধা,ইজিরে, ২০০০ সনে লেখা বিজগ চেই আগে ২০০৫ সনে,লোগাঙ বামর হালে নালে ২০০৭ সনে,দোয্যাকুল কক্সবাজার ২০০৯ সনে,পাত্তরী মা শিঙোর তগায় ২০০৯ সনে, লেখা। আমি ভিন্ন ধারার কবিতা  সৃষ্টির প,ে হতে পারে সেটি সনেট বা চর্তূদশপদী, হতে পারে সেটি  অমিত্রার ছন্দে, আমি মনে করি এতে কবির কবিত্ব বা তার আসল রূপটি প্রস্ফুটিত হয়। ১৯৭৪ সন হতে ২০১০ পর্যন্ত দীর্ঘ পরিক্রমায়  মৃত্তিকা এ ধারার একটি কবিতাও লিখলো না।  যা হোক, এসব কবিতা আবৃতি করা হলে  হয়তো বা অনেকের ভালো লাগবে। তবে চাকমা কবিতার আবৃতি শিল্পী কেউ আছে কিনা আমি জানি না।

মৃত্তিকার কবিতার বইটি হাতে পেয়ে বর্তমান সাংস্কৃতিক প্রোপটে আমি ভেবেছি কতটা অধ্যবসায়,কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে এ সৃষ্টি। আমি এ সব উদ্যোগের সহযাত্রী, তাই কবি গুরুর কথায় বলতে হয় ”যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে”। সরকারী , বেসরকারী সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের প্রসারিত হাতের মাধ্যমে। আগামীতে শুধু কবিতার বই নয়,প্রকাশিত হবে বিভিন্ন ধরণের বই। আমার আশাবাদ অবশ্যই একদিন  বেশ কিছু চাকমা গান হয়তো বেড়িয়ে আসবে তার এ কবিতার বই থেকে।

Print Friendly, PDF & Email

এই বিভাগের আরো লেখা পড়তে নিচের দেওয়া শিরোনাম এ ক্লিক করুন

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*
*